Boanthropy – শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ‘Bos’ অর্থাৎ গরু এবং ‘Anthropos’ অর্থাৎ মানুষ এর সংমিশ্রণে। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ নিজেকে গরু ভাবতে শুরু করেন এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করেন। যেমন – ঘাস খাওয়া, চতুস্পদ প্রাণীর মতো হাঁটা, গরুর মতো ডাক দেওয়া ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য : –
ব্যক্তির বিশ্বাস – তিনি মনে করেন যে তিনি সত্যিই গরু।
আচরণগত পরিবর্তন – মাটিতে হাঁটা, ঘাস খাওয়া, গরুর মতো আওয়াজ করা ইত্যাদি।
সচেতনতা হারানো – অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বুঝতেও পারেন না তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছেন।
সম্ভাব্য কারণ : –
মনস্তাত্ত্বিক আঘাত (Psychological Trauma)
স্বপ্ন বা হিপনোসিস থেকে উদ্বুদ্ধ ধারণা
মনোরোগ যেমন Schizophrenia বা Bipolar Disorder
অবিশ্বাস্য রকমের আত্মপরিচয় সংকট
ঐতিহাসিক তথ্য : –
রাজা বিতীয় নেবুচাদনেজার (Nebuchandnezzar, যার অর্থ “নবু, আমার উত্তরাধিকারীর উপর নজর রাখো”) নামে প্রাচীণ ব্যাবিলনের রাজা, যিনি লেভান্টে তাঁর সামরিক অভিযান এবং ইহুদি ইতিহাসে তাদের ভূমিকার জন্য এবং ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের জন্য বিখ্যাত, একবার গরুর মতো আচরণ শুরু করেছিলেন। কথিত আছে, রাজা (নাকি) ৭ বছর ধরে এই ভয়ানক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বাইবেলে (Book of Daniel 4)-এ এটির উল্লেখ আছে, যা অনেকেই Boanthropy-এর প্রাচীণতম বর্ণনা বলে মনে করেন।
চিকিৎসা : –
Boanthropy সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগ না হলেও এটি একটি অসাধারণ মানসিক উপসর্গ হিসাবে ধরা হয়। চিকিৎসা হিসাবে ব্যাবহার করা হয় –
সাইকোথেরাপি
মেডিকেশন ( যদি Schizophrenia বা Bipolar Disorder থাকে)
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT)
ধৈর্য্য ও মনোসমর্থনের মাধ্যমে
অন্য দৃষ্টিভঙ্গি : –
Boanthropy কখনও কখনও নাটক, সাহিত্য বা সিনেমায় প্রতীকী আত্মপরিচয়ের ভাঙন বা নি:সঙ্গতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়।
কখন শুরু হয় : –
ঘুম ভেঙে উঠে আচমকা বিশ্বাস
হিপনোটিক ট্রান্সে গিয়ে ধারণা জন্মায়
কখনও কখনও ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পর
একটি আকর্ষনীয় তত্ত্ব বলে – কোনও কোনও সময় ব্যক্তি এমন মানসিক চাপে পড়েন যে তিনি বাস্তব জীবন থেকে পশু জীবনে পালিয়ে বাঁচতে চান।
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা (Spiritual Interpretations) : –
অনেক ধর্মীয় বা উপজাতীয় বিশ্বাসে Boanthropy একধরণের দেবতা বা প্রাকৃতিক শক্তির অধিগ্রহণ বলে ধরা হয়। অনেক শামান ( shaman) বা সাধু-সাধিকা নানা পশুর আচরণ নকল করে ধ্যান বা সংযোগ স্থাপন করতেন। সেখান থেকেও এই রোগ জন্ম নিতে পারে।
Boanthropy নিয়ে গবেষণা : –
এটি নিয়ে খুব বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি, কারণ এটি অত্যন্ত বিরল। এখনও পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এই রোগের ডকুমেন্টেড রোগী মাত্র ৩৫-৪০ টি, তবে অঘোষিত কম-বেশি হতে পারে – বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বা ধর্মীয় পরিবেশে।
একই ধরণের শব্দ : –
Boanthropy মূলত Zoanthropy -র একটি নির্দিষ্ট প্রকার। Zoon -র অর্থ পশু আর Anthropos অর্থাৎ মানুষ, একসাথে -- যে সমস্ত মানুষ পশুর মত আচরণ করেন, তাদের বোঝায়।
একইরকমভাবে, Lycanthropy (Lycos -র অর্থ নেকড়ে) ও Cynanthropy (Kyon -র অর্থ কুকুর) হয়ে যাওয়ার বিভ্রম ইত্যাদি প্রভৃতি।
Boanthropy জিনগত নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্বের ধরণে নির্ভর করতে পারে
যারা অতিমাত্রায় সংবেদনশীল, কল্পনাপ্রবণ বা ভেতরে ভেতরে পালিয়ে যেতে চায় বাস্তবতা থেকে, তাদের Boanthropy হবার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
এরা আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পায়
Boanthropy-তে আক্রান্ত রোগীরা আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পায়, কারণ এরা নিজেদের মানুষরুপে দেখতে চায় না। এরা আয়না ঢেকে রাখে অথবা ভাঙে।
Boanthropy নিয়ে কাজ
এটা এমন একটা থিম যা নিয়ে দারুণভাবে কাজ করা যেতে পারে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে। কারণ এতে আছে –
মনস্তত্ত্ব
সামাজিক বিদ্রুপ
আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
এক (ভয়ংকর) মানবিক ট্র্যাজেডি
Boanthropy-কে অনেকসময় ‘Existential Crisis'-এর চূড়ান্ত রূপ বলা হয়
নিজের পরিচয় হারিয়ে, নিজের মানব সত্তাকেই অস্বীকার করে কেউ যদি প্রাণী হয়ে ওঠে এবং সেটা বিশ্বাস করা শুরু করে – তাহলে সেটা আত্মপরিচয়ের শেষ ধাপ। এটিকে একধরণের মনোবিশ্লেষণমূলক সিম্বল হিসাবেও দেখা যায়।
Boanthropy এবং Temporal lobe Epilepsy
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কের temporal lobe-এ অস্বাভাবিকতা আছে (বিশেষত epilepsy), তারা অনেক সময় বিভ্রমে ভোগে – নিজের শরীর, নাম এমনকি জীবের পরিচয়ও ভুল মনে করে।
Boanthropy এই ধরণের বিভ্রমের চূড়ান্ত রূপ হতে পারে।
Boanthropy-তে আক্রান্ত অনেক রোগী বলেছে – তারা অনুভব করে “একটি পশুর আত্মা তাদের শরীরে ঢুকেছে”
এটা শুধু বিভ্রম না, অনেকসময় এটি একটি Spiritual Possession feeling হয়ে দাঁড়ায় – বিশেষ করে যেসব সংস্কৃতিতে পশু আত্মা নিয়ে বিশ্বাস প্রচলিত ( যেমন – আফ্রিকা, আমাজন, ভারতীয় আদিবাসী অঞ্চল)।
Boanthropy কখনও কখনও “Identity Regression Therapy” হিসাবেও দেখা হয়
মানসিক বিশ্লেষণে একে regression to a primal state বলা হয়। মানে, মানুষ চাপে পড়ে ‘সভ্য মানুষ’ থেকে পিছিয়ে যায় প্রাচীণ, সহজাত প্রাণীর স্তরে।
আধুনিক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি(VR)-তেও Boanthropy হতে পারে
২০২৩ সালে এক গবেষণায় VR হেডসেটে দীর্ঘ সময় গরুর মতো মোডে থাকার পর এক ব্যবহারকারী আত্মপরিচয় হারিয়ে কিছুদিন গরু ভেবেছিলেন নিজেকে।
একে বলে technological induced Boanthropy!
Boanthropy ও Mirror Neurons-এর সম্পর্ক
আমাদের মস্তিষ্কে কিছু বিশেষ কোষ আছে – যাকে বলে Mirror Neurons,যা অন্য প্রাণীর আচরণ নকল করতে সাহায্য করে ( যেমন – শেখা, অভিনয়)। Boanthropy-র রোগীদের মধ্যে এই Mirror Neurons অত্যধিক সক্রিয় হয়ে পড়ে, যার ফলে তারা শুধু দেখে নয় – অনুভবও করতে শুরু করে যে তারা গরু।
Boanthropy, Art therapy এবং নিরাময়
Boanthropy-র রোগীদের চিত্র আঁকা বা মাটির কাজ (clay modeling)-এর মাধ্যমে পশু রূপ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
রোগীকে নিজের আঁকা ছবিতে “মানুষ” ফুটিয়ে তুলতে বলা হয়।
এই পদ্ধতিকে বলে self-reconstruction through expression –এটি অত্যন্ত কার্যকর।
কিছু বিশেষ তথ্য :
Boanthropy কখনও কখনও ‘মনুষ্যত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার আাকাঙ্খা’ হিসাবেও দেখা হয়
বহু মনোবিদ বলেন, Boanthropy শুধু বিভ্রম নয় – এটা মানব সভ্যতার ক্লান্তিকর বাস্তবতা থেকে মুক্তির চিৎকার।
যুদ্ধ, কর্পোরেট দৌড়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা – এসব ছেড়ে কেউ যদি মনে করে “আমি গরু হলে শান্তিতে থাকতাম”, তাহলে সেটা কি সত্যিই পাগলামি?
Boanthropy ও জেন দর্শন
জেন দর্শনে বলে – “ তুমি যদি পাথর ভাবো নিজেকে, তুমি পাথর”।
Boanthropy-র একধরণের ব্যাখ্যায় দেখা যায় – এটি সত্তার নতুন উপলব্ধি, যেখানে ‘মানুষ’ আর ‘পশু’ আলাদা নয়।
কিছু জেন মাস্টার নিজের চেতনা প্রসারণে পশু হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়েছেন এবং এটিকে “বুদ্ধিপূর্ণ ধ্যানের চূড়ান্ত রূপ” আখ্যা দিয়েছেন।
Boanthropy এবং Cellular Memory তত্ত্ব
কিছু গবেষক বিশ্বাস করেন আমাদের দেহকোষে পূর্বজন্ম বা প্রজাতির স্মৃতি লুকিয়ে থাকে। Boanthropy-তে সেই পুরনো “গরু সত্তা” হঠাৎ করে স্মৃতি হিসাবে জেগে ওঠে।
Boanthropy রোগীরা প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ অনুভব করে
এরা গাছের পাতায় শান্তি খুঁজে পায়।
পাখির ডাক শুনে কাঁদে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে – “ মানুষ কেবল আকাশ দখল করতে চায়, আমি শুধু দেখতে চাই”।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন